শুভ্র আকাশ আর সাদা কাশফুলই বলে দেয় এখন শরৎকাল

শুভ্র আকাশ আর সাদা কাশফুলই বলে দেয় এখন শরৎকাল

মাহফুজ বাবু ; প্রকৃতিতে শরৎকাল এলে কাশফুলই জানিয়ে দেয় শুভ্র শরতের আগমন বার্তা। ষড়ঋতুর দেশ এই বাংলাদেশ ঋতু পরিবর্তনের ধারায় এখন শরৎকাল। নাগরিক কোলাহল আর যাপিত জীবনের নানা ব্যস্ততার মাঝে চুপিচুপি আসে শরৎ। শরতের বিকালে নীল আকাশের নিচে দোল খায় শুভ্র কাশফুল। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা শরৎ ছাড়া আর কেই বা ভাসাতে পারে? আর তাই বুঝি শরতের বন্দনায় বিমোহিত হয়ে জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন–
“কাশফুল মনে সাদা শিহরন জাগায়,
মন বলে কত সুন্দর প্রকৃতি,
স্রষ্টার কি অপার সৃষ্টি।”
প্রকৃতিতে শরৎ মানেই নদীর তীরে তীরে কাশফুলের সাদা হাসি। নদীর দুই ধারে, জমির আইলে শরৎকালের সেই চিরচেনা দৃশ্য আর দেখা যায় না। কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে কাশবন। এখন গ্রাম–বাংলায় বিচ্ছিন্নভাবে থাকা যে কয়টি কাশবন চোখে পড়ে সেগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সেখানে এখন তৈরি হয়েছে মৌসুমী ফসলের ক্ষেত।
প্রকৃতির এ অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় কেবল মাত্র গ্রামাঞ্চলে। তাই তো প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ছুটতে হয় ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় ছোট কোনো গ্রামে।
এই সাদা মায়াবী বুনো কাশফুলের দেখাই মিলল বুড়িচং উপজেলার কালকার পাড় এলাকায় বিলের মাঝে ব্রিকস ফিল্ডের উচু মাটির ঢিবিতে। সেখানে ফুটে আছে সাদা কাশফুল। এ দৃশ্য প্রকৃতি প্রেমী সহ ছোটবড় সবারই নজর কাড়ে। সড়ক থেকে হপটে সেখানে যেতে হবে দুর্বা ঘাস মাড়িয়ে, লজ্জাবতীর মায়াবি পরশ ডিঙিয়ে। গোমতী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা শহর এভাবেই শরতের সৌন্দর্যকে শুইয়ে দিচ্ছে সাদা কাফনের ভেতরে। শরতে মাঠে মাঠে এখন নতুন ধানের ক্ষেতে সবুজের সমারোহ। কৃষকের মনে নবীন আশা, সাজ সাজ রব। দোয়েল–কোয়েলের কুজনে মুখরিত পল্লী গ্রাম–মাঠ–ঘাট, জনপদ। বিশেষ করে হিন্দু সমপ্রদায়ের ঘরে ঘরে প্রহর গোনা শুরু হলো এই শরতে, কৈলাশ ছেড়ে দুর্গতিনাশিনী দুর্গা আসবেন তাদের গৃহে। নদীর পাড়ে কাশফুলের জেগে ওঠার আভাস দেখেই বাতাসে রটে গেছে শরৎ এসেছে, পূজা আসছে। এ কাশবন চাষে বাড়তি পরিচর্যা ও সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। শ্রষ্ঠার আপন মহিমায় আপনা থেকে বীজ ছিটিয়ে দিয়েই কাশবনের সৃষ্টি করে থাকে। এই কাশবনের আবার ব্যবহার বহুবিধ। চারাগাছ একটু বড় হলেই এর কিছু অংশ কেটে গরু–মহিষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। কাশ দিয়ে গ্রামের বধূরা ঝাঁটা, ডালি, দোন তৈরি করে থাকে। আর কৃষকরা ব্যবহার করে ঘরের ছাউনি হিসেবে। কিন্তু শহরের যান্ত্রিক জীবনে এর রূপ দেখার সময় কোথায়!কাশফুল মূলত ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। ঘাস প্রজাতির উদ্ভিদ হওয়ায় এর মূল গুচ্ছমূল। কাশফুল আগাছা হিসেবে বিবেচিত হলেও শুকনো কাশগাছ খুব কাজের জিনিস। কাশগাছ দিয়ে তৈরি করা হয় মাদুর, সীমানার বেড়া। এমনকি ঘরের চালও ছাওয়া হয়। শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ! কবিগুরুর শরৎ বন্দনায় ধরা পড়েছে শরৎ-প্রকৃতির মোহনীয় রূপ। তাইতো তিনি লিখেছিলেন,
“আজি কি তোমার মধুর মুরতি
হেরিনু শারদ প্রভাতে!
হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ
ঝলিছে অমল শোভাতে।”
এ সময় না আছে গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ, না আছে বর্ষার অঝোর ধারার বৃষ্টি। আছে শুধু আলোকোজ্জ্বল ঝলমলে দিন, জ্যোৎস্না রাত,মৃদুমন্দ সমীরণ আর সেই সমীরণে দুলতে থাকা শুভ্র কাশবন। আবার শুভ কাজেও এই কাশফুলের পাতা বা ফুল ব্যবহার করা হয়। মূল ব্যবহার হয় ঔষধি হিসেবে। কাশফুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম হল Saccharum spontaneum. এরা ঘাসজাতীয় জলজ উদ্ভিদ। চিরল পাতার দু’ধারে খুবই ধার। পাখির পালকের মতো নরম এর সাদা ফুল।
যদিও পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে শরতের অপরূপ সেই রূপ-মাধুর্য এখন আর আগের মতো নেই। তবুও ঋতুচক্রে শরৎ আসে আবার চলে যায় । আর এই ঋতুচক্রের বর্ণিল দোলায় উদ্ভাসিত হোক স্নিগ্ধ শরতের শুভ্র কাশফুল।

Categories: লাইফস্টাইল

Tags: