প্রধানমন্ত্রী নির্দেশের পর নতুন ওষুধ আনার জন্য দৌরঝাপ শুরু দুই নগর পিতার

প্রধানমন্ত্রী নির্দেশের পর নতুন ওষুধ আনার জন্য দৌরঝাপ শুরু দুই নগর পিতার

ডেক্স রিপোর্ট : বেড়েই চলছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। ঢাকার ছোট-বড় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ঠাঁই হচ্ছে না। ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা নিধনে সিটি কাপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে আগেই। তারা যে মানের ওষুধ দিয়ে মশা নিধন করছে সেটা অকার্যকর। এসব ওষুধে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও একই ওষুধ দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে মশা নিধন। এ ছাড়া নেই পর্যাপ্ত মশা নিধন কর্মী। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল কর্মী নিয়ে ঢিমেতালে চলছে কার্যক্রম। কিছু কিছু ওয়ার্ডের জন্য মশা নিধনের বাজেটও নেই।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর নতুন ওষুধ আনার তোড়জোর শুরু করেছে দুই সিটি করপোরেশন।

দুই সিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। তারা পুরাতন ওষুধ বদল করে নতুন ওষুধ আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, দুই সিটি কর্পোরেশন মিলে গতকাল (সোমাবার) সকাল থেকে আমরা বৈঠক করেছি। আমরা প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার জন্য নতুন ওষুধের নমুনা নিয়ে আসব। তারপর যদি ভাল ফলাফল পাওয়া যায় তবে ওই ওষুধই নিয়ে আসব। তিনি বলেন, আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি। ওষুধ পরিবর্তন করতে গিয়ে অনেক প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। তারপরও খুব দ্রুত সময়ের ভেতরে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি।

মশক নিধনে পর্যাপ্ত লোকবল নেই: মশক নিধনে সিটি কর্পোরেশনের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠার পর কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছেন, তাদের পর্যাপ্ত লোকবল নেই। দীর্ঘদিন ধরে লোকবলের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। তাই প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল লোকবল নিয়েই মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। এছাড়া পর্যাপ্ত উপকরণও নেই। প্রতিটা ওয়ার্ডে মাত্র ২/৩ জন কর্মী দিয়েই চলে কার্যক্রম। এ অবস্থা দুই সিটি কর্পোরেশনেরই। সূত্রমতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার ১০টি অঞ্চলে (নতুন যুক্ত পাঁচ ওয়ার্ড) মশা নিধনের কর্মী আছেন ৪২৯ জন। এর মধ্যে ১৭জন সুপারভাইজার, ৩জন আইসি (ইনসেক্ট কালেকটর), ১১০ জন ক্রু, ১৬৯ জন স্প্রেম্যান ও ১৩০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী রয়েছেন। এসব কর্মীদের মধ্যে ৪০৯ জন সরাসরি মশক নিধনের কাজে জড়িত। এদের মধ্যে থেকে ৫৮ জনকে ডিএসসিসির নতুন ৫টি অঞ্চলে নিয়োগ দেয়া হলেও বাজেট, যন্ত্রপাতি না থাকার কারনে এসব অঞ্চলে এখনও মশক নিধন কাযক্রম শুরু হয়নি।

এদিকে উত্তর সিটি এলাকায় মশা নিধনের জন্য কর্মী আছেন মাত্র ২৮০ জন। এছাড়া ২৫০জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সূত্রমতে, মশা নিধনে উত্তর সিটির ৬৫২টি মেশিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে মেশিনের সংখ্যা ৭৮১টি। এর মধ্যে ফগার মেশিন ৩২২টি, হস্তচালিত ৪৪৯টি এবং হুইল ব্যারো মেশিন ১০টি। এসব মেশিনের মধ্যে বেশ কিছু মেশিন বিকল আছে। আর দক্ষিণ সিটিতে মশক নিধনের জন্য ৯৪০টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪২টি হস্তচালিত, ৪৪৭টি ফগার ও ৫১টি হুইল ব্যারো মেশিন । হস্তচালিত মেশিনগুলোর মধ্যে ২০৮টি ও ফগারের ১৮৬টি অচল এবং হুইল ব্যারো ১৮টি মেশিন অচল।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডসহ) আয়তন ২৭০ বর্গকিলোমিটার। দক্ষিণের ৭৫টি ও উত্তরের ৫৪টি ওয়ার্ড মিলিয়ে ১২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ডে প্রায় আড়াই কোটি (বেসরকারি হিসাব মতে) মানুষের বসবাস। অথচ বিশাল এই আয়তনের আড়াই কোটি মানুষের শহরে মশা নিধনের জন্য মাত্র ৭০৯জন কর্মী রয়েছেন। গড়ে প্রতিটা ওয়ার্ডে মাত্র ৩/৪ জন কর্মী কাজ করছেন। যা দিয়ে একটি ওয়ার্ডের সর্বত্র মশা নিধন সম্ভব হয় না।
মহল্লায় মহল্লায় ক্ষোভ: ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব এখন ঢাকার প্রতিটা অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি এলাকার মানুষ এখন আতঙ্কে রয়েছেন। অথচ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে কার্যত কোন প্রদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। উত্তর বাসাবো এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, গত দুমাসের মধ্যে একদিন আমি মশা নিধনের কর্মীদের দেখেছি। সেটা আবার মূল সড়কে। যেখানে মশার আস্তানা সেখানে তারা কোন ওষুধ দেননি। তিনি বলেন, আমার বাসার আশে পাশে দুই মেয়ে ও এক ছেলে শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু রোগে।

বাসাবো মাঠ এলাকার বাসিন্দা জহিরুল বলেন, আমার মনে নেই ঠিক কবে আমি সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কর্মীকে দেখেছি। মুগদা এলাকার বাসিন্দা পলাশ বলেন, সন্ধ্যার পর মশার আনাগোনা অনেক বেড়ে যায়। এই এলাকাটা অন্য এলাকার চেয়ে কিছুটা নোংরা। তাই মশার উৎপাতটা বেশি। অথচ এই এলাকায় মাসে একবারও মশা মারা হয় না। ফার্মগেট রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দা রহমত হোসেন বলেন, আমার পরিবারের দুইজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এছাড়া এলাকার অনেকেই এখন আক্রান্ত। তিনি বলেন, মাসখানেক আগে একবার মশা মারতে দেখেছিলাম।

আর দেখি নেই। মহাখালী এলাকার সৈকত হাসান বলেন, আমার বাসার পাশেই সিটি করপোরেশনের অফিস। কিন্তু মশার যন্ত্রণা এখানেই বেশি। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, আমরা এখন আর সিটি কর্পোরেশনের অপেক্ষা করি না। নিজেরাই মশা মারার ব্যবস্থা করছি। কারণ তাদের অপেক্ষায় থাকলে ডেঙ্গুতে মরতে হবে।
নতুন ওয়ার্ডে মশা নিধনের বরাদ্দ নেই: দুই সিটি কর্পোরেশনে নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ডে মশা নিধনের জন্য কোনো বাজেট নেই। নেই কোনো জনবল ও যন্ত্রপাতি। এসব এলাকায় মশক নিধন করা হচ্ছে না। তাই নতুন অর্ন্তভূক্ত এসব এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। সিটি করপোরশেনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে নতুন ওয়ার্ডগুলোতে কিছু জনবল ও যন্ত্রপাতি দিয়ে মশক নিধন চলছে। কিন্তু দক্ষিণ সিটির নতুন ওয়ার্ডগুলোতে সেটা হচ্ছে না।

Categories: জাতীয়,টপ নিউজ,প্রধান নিউজ,প্রধানমন্ত্রী নির্দেশের পর নতুন ওষুধ আনার জন্য দৌরঝাপ শুরু দুই নগর পিতার

Tags: