আতংকে কাটেনি দেবিদ্বার রাধানগর গ্রামে

আতংকে কাটেনি দেবিদ্বার রাধানগর গ্রামে

মাহফুজ বাবু : হঠাৎ কেন এ হত্যাযজ্ঞ চালায় এলাকার নিরিহ ভদ্র শান্ত ছেলেটা ? কেন হঠাৎ এমন রক্তনেশায় মেতে উঠলেন সাধারণ এক রিকশাচালক মোখলেছুর রহমান (৩৫)। কেউ ভাবছে কথা কাটাকাটির জেরে আবার কেউ কেউ ধারণা করছেন পূর্বশত্রুতার জেরে এই ধত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ঘাতক। কিন্তু এই দুটির একটি বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। বলছিলাম দেবিদ্বারে গত বুধবার সকালে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা।

ভুক্তভোগী ও আহতদের বর্ননায় সেদিনঃ-
‘ঘরে ভাত খাইতাছি আমার বৌয়ের (স্ত্রী)নাজমা আক্তার (৩৬) চিৎকারের আওয়াজ শুনে দৌঁড়ে বাইরে যাই। দেখি স্ত্রী রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি করতেছে। মা ডাক দিলেন, আমারে বাঁচা। মা’র দিকে যেতে না যেতে মার গাড়ে ও পিঠে একটা কোপ দিয়ে ফেলেছে। ডান দিকে একটা কাঠের টুকরা দেখলাম। কাঠটা হাতে নিতে দেখেই মোখলেস রামদাটা আমার পেটে নিক্ষেপ করে। আমার আর কিছু মনে নেই। আমি তখন অজ্ঞান।’ হাসপাতে ভর্তি নিহত নাজমা আক্তারের স্বামী নুরুল ইসলাম এভাবেই জানান দেবিদ্বার রাধানগরে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনার বর্ণনা। তার মা মাজেদা বেগম এবং সে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তার মতে, এদিন রাধানগরে যেন কেয়ামত নেমে এসেছিলো।
রক্তের নেশায় উন্মাদ মোখলেসের ধারালো দা’য়ের কোপে আহত কুমকে ভর্তি আরেকজন কাঁচা মাল ব্যবসায়ী আ. লতিফ। ঘাতক মোখলেছের বাড়ির উঠান দিয়ে তার বাড়ির চলার পথ। আ. লতিফ বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো খাড়িতে করে মালামাল নিয়ে নিমসার বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। দেখলাম সে বড় বড় চোখ করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি বললাম, কি রে মোখলেছ। কথাটা শেষ না হতেই মাথা টার্গেট করে একটা কোপ। কোপটা আমার গর্দানে পড়ে। আরেকটা কোপ দিয়েছে, সেটা হাত দিয়ে রক্ষা করি।’ ৬ মেয়ে ১ ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার লতিফের। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিটি কুমেকে ভর্তি।
বহুদিন পর বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন রাবেয়া বেগম (৩৬)। স্বামী ছেলে-মেয়ে নিয়ে চট্টগ্রামে থাকেন তিনি। মানুষের চিৎকার শুনে উঠানে যান রাবেয়া। সেখানেই এতোপাতাড়ি ভাবে ৫টি কোপ দেয় তার পিঠে।
রেহাই পায়নি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফাহিমা (৮)। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কুপিয়ে যখম করা হয় তাকেও । এ শিশুটির পিঠে ও বাম হাতে দু’টি কোপ দেওয়া হয়েছে।
বাড়ির পাশে পতিত জমিতে কাজ করছিলেন জাহানারা বেগম। দৌঁড়ে এসে তার হাতে একটি ও পিঠে দু’টি কোপ দিয়ে চলে যায় মোখলেছ।
গতকালের হত্যাকান্ডের প্রায় অংশের প্রত্যক্ষ সাক্ষী জাহানারা বেগমের দাদা মো. বজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যাকে সামনে পাইছে তারেই কোপাইছে। আমি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেই। ১০-১৫ মিনিট এ কান্ডটা চলতে থাকে। এরপর মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হলো, মোখলেছ সবার কল্লা কেটে ফেলতেছে। যে যেখানে থাকুন সবাই এগিয়ে আসেন।’
মাইকে ঘোষণা শুনে ‘যে সেখানে ছিলো সবাই দৌঁড়ে আসলো। দোকানের সামনে থেকে কেউ হুন্ডায়, কেউ অটোতে করে আসলো। দা ফেলে সে পালিয়ে যাওয়ার সময়। তাকে সবাই ধরে আনলো। শতশত লোকজন তাকে এলোপাতাড়ি মারা শুরু করলো ঘাতক মোখলেস ও মারা গেলো সেখানে’
আহত আ. লতিফ জানায়, ‘কয়েক বছর আগে মোহনপুর ইউনিয়নের তালতলা গ্রাম থেকে এখানে এসে নতুন বাড়ি করে মোখলেস। এলাকাতেই রিকসা চালাতো, পরিবার নিয়ে ভালই চলছিলো। কারো সাথে কোন ঝামেলা নাই। নামাজও পড়তো নিয়মিত। হঠাৎ কী হলো বলতে পারি না। কেয়ামত দেখছি সেদিন গেমারে। ’
গত বুধবার সকালে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের সকাল আনুমানিক ১০টায় ঘটে যায় এক নৃশংস ঘটনা।
ঘটনার দুদিন কেটে গেলেও রেশ কাটেনি এখনো। এখনো আতংকিত গোটা এলাকার মানুষ। এ যেন এক বিভীষিকাময় দিন ছিলো এলাকার মানুষের জন্য। স্বজনহারাদের কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে আছে এলাকার পরিবেশ। রক্তের ছোপ ছোপ দাগ এখনো দেখা যায় সড়কে আর উঠোনে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘাতক মোখলেছুর রহমান ওই গ্রামের মর্তুজ আলী ওরফে মুতু মিয়ার ছেলে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে রিকশা চালিয়ে চান্দিনার বাগুর থেকে একটি ব্যাগে করে ধারালো লম্বা ছেনি নিয়ে বাড়িতে আসেন। এসেই প্রথমে তার স্ত্রী রাবেয়া বেগমকে তাড়া করেন। দৌড়ে পালিয়ে রক্ষা পান স্ত্রী। এর পর প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম, তার স্ত্রী নাজমা বেগম ও মা মাজেদা বেগমকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করেন মোখলেছ। এতে ঘটনাস্থলেই নাজমার মৃত্যু হয়। পরে ঘাতক একই বাড়ির মৃত শাহ আলমের ছেলে আবু হানিফকে (১০) এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন। এ সময় শিশু হানিফের মা আনোয়ারা বেগম আনু ছেলেকে বাঁচাতে দৌড়ে এলে তাকেও কুপিয়ে হত্যা করেন। মা ও ছেলের হত্যা নিশ্চিত করে ঘাতক মোখলেছ রক্তমাখা উন্মুক্ত ধারালো ছেনি নিয়ে বাড়িতে ও রাস্তায় জাহানারা বেগমসহ আরও অন্তত তিন/চার জনকে কুপিয়ে আহত করে।
এ সময় অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয়রা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জড়ো করেন। পরে এলাকাবাসী একত্র হয়ে মোখলেছকে পিটিয়ে হত্যা করেন। এ ছাড়া মারাত্মক আহত নুরুল ইসলাম, আঃ লতিফ ফাহিমা, রাবেয়া বেগম, মাজেদা বেগম ও জাহানারা বেগম সহ অন্যান্যদের উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ ঘাতক মোখলেছের স্ত্রী রাবেয়া বেগম ও ভাবি মরিয়ম আক্তারকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

নিহতের স্ত্রী জানান, তাদের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। তার স্বামী মাদকাসক্ত কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন না। মাঝেমধ্যে তার মাথা ব্যথা হতো। নিয়মিত মাথা ব্যথার ট্যাবলেট খেতেন। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে বিকালে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু গতকাল সকাল ১০টার দিকে বাসায় ফিরে ধারালো ছেনি (দা) নিয়ে সামনে যাকে পেয়েছেন তাকেই কুপিয়েছেন। কিন্তু কী কারণে হঠাৎ এতগুলো মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন, তা তিনি জানেন না।
এ দিকে ঘটনার খবর পেয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) সাখাওয়াৎ হোসেন, দেবিদ্বার সার্কেল মো. আমিরুল্লাহ ও ওসি মো. জহিরুল আনোয়ারসহ পুলিশের অন্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। শত শত লোক ঘটনাস্থলে ভিড় করে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম জানান, ঘাতক মাদকাসক্ত কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেনÑ এমন তথ্য তার জানা নেই। এমন নৃশংস হত্যাকান্ডে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আনোয়ার গতকাল বিকালে বলেন, ঘাতক মোখলেছ এলোপাতাড়ি ৮-৯ জনকে কুপিয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা ঘাতকসহ চারজনের মরদেহ পেয়েছি। হাসপাতালে আরও দুজনের মৃত্যুর গুজব থাকলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। জেলা পুলিশ সুপার মহোদয়ে নির্দেশে আহতদের সার্বিক চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া হয়েছে।

নৃশংস এ ঘটনায় এখনো কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনার আগের রাতে ঘাতক মোখলেছুর রহমানের বাড়িতে অপরিচিত ৫ ব্যক্তিকে এবং ঘটনার দিন সকালে বোরকা পরিহিত এক নারীকে বাড়ির লোকজন দেখতে পায়। ওই ব্যক্তিরা কারা, কী তাদের পরিচয়, কেন ঘাতক মোখলেছের বাড়িতে তারা আসলো? এ নিয়ে এলাকায় চলছে নানা গুঞ্জন।
অপরিচিত ঐ ৫ ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে নিহত মোখলেছের স্ত্রী রাবেয়া বলেন, ‘ঘটনার দিন সকালে আমি ঢাকা থেকে এসেছি। রাতে বা সকালে বাড়িতে কে আসছে আমার জানা নেই।’
নিহত আনোয়ারার বড় মেয়ে আকলিমা ও ছোট মেয়ে নিপা আক্তার জানান, ঘাতক মোখলেছের বাড়িতে ঘটনার আগের দিন অপরিচিত কিছু লোককে দেখতে পায় তার বাড়ির লোকজন। ওই লোকজনের পরিচয় পাওয়া গেলে ঘটনার রহস্য জানা যেতে পারে।
এ ব্যাপারে সুলতানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঘাতক মোখলেছ একজন সাধারণ রিকশাচালক হওয়ার পরও তার বাড়িতে পাকা বিল্ডিং! এর পিছনে রহস্য আছে। রিকশা চালানোর পাশাপাশি সে মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার আগের রাতে তার ঘরে নারী-পুরুষসহ কয়েকজন অপরিচিত লোকও এসেছিল। ওরা কারা? কী জন্য এসেছিলেন? তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে তার স্ত্রী ও বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এ ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে।
সম্প্রতি পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শিশুদের মাথা কাটার বিষয় অর্থাৎ আতঙ্ক ছড়ানোর পেছনে কোনো রহস্য আছে কিনা তাও খোঁজ নিতে হবে, যোগ করেন শফিকুল ইসলাম।
এদিকে গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত হওয়ার পর ঘাতক মোখলেছের বাড়িতে আর কাউকে পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা ডিএসবির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিম উল আহসান জানান, সকালে মোখলেছ রিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। পথিমধ্যে এক অটোরিকশাচালকের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে বাড়িতে ফিরে এসে স্ত্রীর সঙ্গেও ঝগড়া করেন। এর পর একটি দা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। পরে দুই নারী ও এক শিশুকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজনকে মারাত্মক জখম করেন। ওই সময় স্থানীয়রা তাকে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেন।
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহিরুল আনোয়ার মুঠো ফোনে জানান, পুলিশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ হত্যার পিছনে যদি কোনো রহস্য থেকেও থাকে তা খতিয়ে বের করা হবে। কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দুটো আলাদা মামলা দায়ের করা হবে।

Categories: অপরাধ ফলোআপ,কুমিল্লা,প্রধান নিউজ

Tags: