ইন্দ্রনগর ফাজিল মাদ্রাসার রেজুলেশন খাতা জালিয়াতি করে ভূয়া উপাধ্যক্ষ নিয়োগের অভিযোগ

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতার ইন্দ্রনগর হুসাইনাবাদ ফাজিল মাদ্রাসার রেজুলেশন খাতা জালিয়াতি করে এক শিক্ষক ও এক কর্মচারিকে চাকুরিচ্যুত করার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এতে মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামী মাওলানা আকবর আলীর এক ছেলেকে অবৈধভাবে পদায়ন ও অপর ছেলেকে চাকুরি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারি প্রতিকার চেয়ে গত রবিবার (৭ জুলাই) মাদ্রাসা সভাপতি বরাবর অভিযোগ দায়ের করলে মাদ্রাসা সভাপতি এসএম আসাদুর রহমান সেলিম তা গ্রহণ না করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।।
স্থানীয় দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতার ইন্দ্রনগর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন ইন্দ্রনগর গ্রামের রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী মামলাসহ কমপক্ষে ১৫টি নাশকতা মামলার আসামী মাওলানা আকবর আলী। অপর দু’ ছেলে ২০১২ সালে ওই মাদ্রাসার আরবী প্রভাষক হিসেবে যোগদানকারি মারুফ বিল্লাহর নামে নাশকতার পরিকল্পনা ও ছোট ছেলে মোহাছিন বিল্লাহর বিরুদ্ধে একাধীক মামলার অভিযোগ রয়েছে।
ইন্দ্রনগর ফাজিল মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর গঠিত নিয়োগ বোর্ডে উপাধ্যক্ষ পদে শেখ শফিউল্লাহ হাবিবি, মোঃ আবু ইউসুফ ও মোঃ আফফান আলী অংশ নেন। প্রথম স্থান অধিকার করেন শেখ শফিউল্লাহ হাবিবি। এবং ২০০১ সালের ২৫ আগষ্ট এমএলএসএস হিসেবে শহীদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
জানা যায়, মাওলানা আকবর আলী ২০১৩ সালে দেশদ্রোহী ও নাশকতা মামলায় পলাতক হওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে মাওলানা আফফান আলীকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করেন এবং ২০১৪ সালে ডিসেম্বরে মাওলানা শেখ শফিউল্লাহ হাবিবি নলতা মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করলে এই সুযোগে রাজাকার আকবর আলী মাওঃ আফফান আলীর সহযোগীতায় পুরাতন রেজুলেশন খাতা গায়েব করে নতুন খাতায় উপাধ্যক্ষ হিসেবে শেখ শফিউল্লাহর পরিবর্তে রাজাকার পুত্র মারুফ বিল্লাহ এবং এমএলএসএস হিসেবে শহিদুল ইসলামের নামের পরিবর্তে রাজাকারের কনিষ্ট পুত্র মোহাছিন বিল্লাহর নাম লিখে তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আওরঙ্গজেব ও উপজেলা শিক্ষা প্রকল্প অফিসারের সাক্ষর জাল করে নতুন ভূয়া রেজুলেশন খাতা তৈরি করেন। একইভাবে রেজুলেশনে জিবি কমিটির অধ্যক্ষ আকবর মাওলনা ব্যতীত উপস্থিত নয় সদেস্যের সাক্ষরও জাল করা হয়েছে। এমনকি ভূয়া রেজুলেশনে তৎকালীন মাদ্রাসা কমিটি সদস্য আব্দুল্লাহ মোড়লের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। নকল রেজুলেশনে যে তারিখে রাজাকারপুত্রদ্বয়দের নিয়োগ প্রদান করা হয় তখন তার কনিষ্ট পুত্রের এসএসসি সনদ অনুযায়ী বয়স ১০ বছর ৮ মাস ২৪ দিন। এবং ১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামোর সরকারি বিধি মোতাবেক ২০০৪ সালে উপাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পেতে আট বছরের অভিজ্ঞতা থাকার নিয়ম থাকলেও তার দ্বিতীয় পুত্র মারুফ বিল্লাহ সেই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
এদিকে নিয়মানুযায়ী কোন প্রার্থীর আত্মীয় বোর্ডের সদস্য থাকার নিয়ম না থাকলেও ২০১২ সালে আরবী প্রভাষক শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে মাওলানা আকবর আলী সদস্য হিসেবে উপস্থিত থেকে মারুফ বিল্লাাহকে মনোনীত করান। ২০১২ সালে আরবী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মারুফ বিল্লাাহকে অনিয়ম ও দূর্ণীতির মাধ্যমে রেজুলেশন খাতা পরিবর্তণ করে মাওঃ আফফান আলী সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষর জালিয়াতি করে ভূয়া রেজিলেশনের মাধ্যমে উপাধ্যক্ষ বানানো এবং এমএলএসএস কর্মী হিসেবে শহীদুল ইসলামকে কর্মচ্যুত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
অভিযোগ, সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আফফান নিজেকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পেতে মাওলানা আকবর আলীর সঙ্গে সমঝোতা করে মারুফ বিল্লাহকে উপাধ্যক্ষ এবং মোহাছিন বিল্লাকে এমএলএসএস বানাতে রেজুলেশন খাতা জালিয়াতি করেন। যদিও ২০১৭ সালের ৪ জুন অধ্যক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলেও নিয়োগ বোর্ড গঠণের আগে বাছাই কমিটি ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই নানাবিধ দূর্ণীতির কারণে মাওলানা আফফানের আবেদন বাতিল করলে সভাপতি অনীহা প্রকাশ করায় নিয়োগ বোর্ড গঠিত হয়নি। এরপরও ওই প্রক্রিয়া অব্যহত রয়েছে।
বিষয়টি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ রফিকুল ইসলাম দূর্ণীতিবাজদের পক্ষ নিয়ে ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে মাদ্রাসার সহ-সভাপতি আলহাজ¦ আবুল হোসেন পাড় ও সদস্য আব্দুল্লাহ মোড়লের কড়া নজরদারিতে তা ব্যর্থ হয়।
জানতে চাইলে ইন্দ্রনগর হুসাইনাবাদ ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ শেখ শফিউল্লাহ হাবিবি বলেন, আমি ২০১৪ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসায় দায়িত্ব পালন করা কালীন অফিসিয়াল সকল খাতাপত্র ঠিকই ছিল।
মাদ্রাসার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, এসব জালিয়াতি যেহেতু আমার দায়িত্বভারকালে হয়নি সেহেতু মাদ্রাসার সভাপতি ব্যাপারটি নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে নিষেধ করেছে।
এবিষয়ে মারুফ বিল্লাহ ও তার ভাই মোহাছিন বিল্লাহর সঙ্গে যথাক্রমে তাদের ০১৮৫৬৮৬০৭৪৮ ও ০১৭১৭-২৮৬৫২৮ নং মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আকবর আলীর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মাদ্রাসার সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আফফান আলী তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মাওলানা আকবর আলী নিজের জমিতে প্রতিষ্ঠান বানিয়েছেন। তার সময়ে পকেট কমিটি থাকলেও এখন স্বচ্ছ পূর্ণাঙ্গ কমিটি রয়েছে। তাই রেজুলেশন জালিয়াতির মাধ্যমে মারুফ বিল্লাহকে উপাধ্যক্ষ ও শহীদুলের নিয়োগ বাতিল করে মোহাছিন বিল্লাহকে ঢোকানো সম্ভব হবে না। বিগত ৩ জুলাই আবারো উপাধ্যক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ায় তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে না দেখতে একটি মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
ওই মাদ্রাসার গভর্ণিং বডির সভাপতি এসএম আসাদুর রহমান সেলিম জানান, বিষয়টি নিয়ে আগামি সভায় আলোচনা করা হবে। রেজুলেশন খাতা জালিয়াতি মেনে নেওয়া হবে না।

Categories: খুলনা,জাতীয়,টপ নিউজ,প্রধান নিউজ,শিক্ষা বাতায়ন

Tags: