ক্ষুধায় ক্ষুধা চিনে

ক্ষুধায় ক্ষুধা চিনে

মু. ইলিয়াস হোসেন : মানিকে মানিক চিনে এ কথাটি আমরা সকলে শুনেছি। তেমনি ক্ষুধায় ও ক্ষুধা চিনে এ কথাটি বলা যায়। বলছিলাম ২২ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশের কথা। গত ৩রা ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রবিবার কথা হয় বিক্রেতাবিহীন বিদ্যানন্দ স্টল , এ বছরের বই মেলায় সাড়া জাগানো ৫৪ নং এ স্টলের কিছুটা দূরে দাঁড়ানো বিপ্লব নামের এক স্বেচ্ছাসেবকের সাথে। তিনি জানান বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠার পিঁছনের রহস্য। তিনি বলেন, বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা ছোট বেলায় ক্ষুধা দারিদ্রের মধ্যে বড় হন। তিনি বুঝেন ক্ষুধার কি কষ্ট! কত যাতনা ক্ষুধার্থের! আর তিনি এখান থেকেই স্বপ্ন দেখেন এমন কিছু করবেন যাতে তার মতো আর কেউ ক্ষুধার্থ না থাকে। আর এরই ফলশ্রুতিতে আজকের বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
এতক্ষণ হয়তো পাঠকের মনে প্রশ্ন চলে এসেছে বিদ্যানন্দ কি? তার আগে একটু জানিয়ে রাখি আপনারা হয়ত এক টাকার আহারের কথা শুনেছেন? হ্যাঁ এই এক টাকার আহার ই বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কক্সবাজার, রামু, রাজবাড়ী, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহে চলছে বিদ্যানন্দের কার্যক্রম। প্রায় ২ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী এ প্রতিষ্ঠানের হয়ে প্রতিদিন সহস্রাধিক পথ শিশুর খাবারের আয়োজন করে থাকেন। পথ শিশুদের শুধু ১ টাকায় খাবারের আয়োজন করেই ক্ষান্ত নয় প্রতিষ্ঠান টি রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। তাদের ৮টি শাখার ৫টিতে বিনামূল্যে পড়ানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং ও ফ্রি করানো হয়। রয়েছে ১ টাকায় আইনী সেবা, চিকিৎসা সেবা, রয়েছে বৃদ্ধাশ্রম এবং এতিম খানা, নারীদের জন্য কর্মসংস্থান (ছোট গার্মেন্টস) । রয়েছে তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের বই প্রকাশের জন্য বিদ্যানন্দ প্রকাশনী।
বিপ্লব কে জিজ্ঞেস করি, এ প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস কি? বিপ্লব জানান, প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশ এটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এগিয়ে এসেছেন সব মহৎ মানুষ জন। বিদ্যানন্দের কাজের স্বচ্ছতা দেখে এগিয়ে আসছেন অনেকে। আমাদের শাখায় যোগাযোগ করে তারা দান করছেন। তাদের মাধ্যমেই চলছে এ কার্যক্রম। এমনকি প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গাও দান করছেন তারা।
প্রশ্ন রাখি বই কেমন বিক্রি হচ্ছে? বলেন- প্রতি বছরের তুলনায় এবছর দু থেকে তিনগুন বিক্রি বেশি হচ্ছে। আমাদের কথা চলছে হঠাৎ একজন লোক এসে বললেন, এটি তো বই বিক্রির একটি কৌশল, কেননা স্টলে প্রতিনিধি নেই, তারপরে স্টলে দু’জন শিশুর ছবি ঝুলানো পাশে আবার লেখা বই কিনে টাকা হিসেব করে রেখে যান যা দিয়ে আমাদের আহার হবে এভাবে মানবতাকে কাজে লাগিয়ে বিক্রি বাড়াচ্ছেন। তখন জবাবে বিপ্লব বলেন- আপনি চাইলে এখান থেকে বই নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে যেতে পারেন , কেউ আপনাকে বাঁধা দিবে না। গতকাল এরকম নিয়ে চলে গেছে। আর আমাদের বই বিক্রি বাড়ানোর জন্য এরকম কার্যক্রম নয়। কারন আমরা চাই সততা স্টলের মত শিশুদের সততা শিক্ষার মত বড়রাও সততা শিখুক। তারাও সততার পরিচয় দিক। আর এ দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদের এ কার্যক্রম।
আমি বিপ্লবকে প্রশ্ন করি, আপনার স্বেচ্ছায় পরিশ্রম করছেন এবং কয়েকদিন আগেও (পৌষ মাসে) দেখলাম শীতের ভিতরে আপনাদের মাত্র একটি কম্বল গায়ে দিয়ে রাস্তায় শোয়ানো হয়েছে কেন এত কষ্ট করছেন বা স্বেচ্ছায় কাজ করছেন? জবাবে বিপ্লব জানান, মানুষের টাকা পয়সা থাকলেই সে কিন্তু সুখী হতে পারে না, যদি তার মানসিক প্রশান্তি না থাকে। আর আমরা এখান থেকে যে মানসিক প্রশান্তি পাই তা বলে বুঝাতে পারবো না। আর আমরা কনকনে শীতের রাত্রে রাস্তায় একটি কম্বল গায়ে এ জন্য ঘুমিয়েছি যে, আমরা যেহেতু অবহেলিতদের নিয়ে কাজ করি, যদি তাদের কষ্টগুলো অনুধাবন করতেই না পারি তবে আমরা ভালোভাবে কাজ করবো কিভাবে? তিনি আরো বলেন, আমরা অকারণে রাস্তায় হর্ণ দেই কিন্তু বুঝতে চাইনা যে ঐ লোকটি এ কনকনে শীতে রাস্তায় প্রায় খালি গায়ে (পোষাকের অভাবে) শুয়ে আছে। তারা কত কষ্ট পাচ্ছে , তারপর ও তাদের একটু ঘুমাতে দিচ্ছি না। বিরক্ত করছি।
চলছে মানবিক কার্যক্রম, চলতে থাকবে এমনই ভাবে। জন্ম নিবেন নতুন নতুন কিশোর কুমার দাশ রা। দেশ হবে ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত। অবহেলিত মানুষরা খুঁজে পাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই। শিক্ষিত আত্মনির্ভরশীল করে সবাইকে গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা সকলে মিলে গড়ে তুলব আমাদের সোনার বাংলা এই প্রত্যাশা।

Categories: মতামত বিশ্লেষণ

Tags: