কোর্ট ম্যারেজ কি? কোর্ট ম্যারেজের আইনগত ভিত্তি আছে কিনা

কোর্ট ম্যারেজ কি? কোর্ট ম্যারেজের আইনগত ভিত্তি আছে কিনা

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘কোর্ট ম্যারেজ’-এর কার্যত আইনি ভিত্তি নেই। কোর্ট ম্যারেজ বলতে আইনে কোনো শব্দও নেই। কিন্তু অভিভাবকদের অমতে অনেক যুগল কথিত এ বিয়েতে আবদ্ধ হচ্ছেন। আবার ভবিষ্যতে বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের আপত্তি বা বাধা এড়ানো যাবে, এ বিশ্বাস থেকেও গোপনে কোর্ট ম্যারেজ করা হচ্ছে। এমনকি বয়স বেশি দেখিয়ে স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরাও এখন এ ধরনের ‘বিয়ে’ করছে। একশ্রেণীর আইনজীবী বেশে টাউট তাদের সহায়তা করছে। ফলে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে কোর্ট ম্যারেজ।
দেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান- আইনি দৃষ্টিতে কোনো ধর্মেই কোর্ট ম্যারেজ বৈধ নয়। অজ্ঞতা ও ভ্রান্ত ধারণা থেকে এটা করা হচ্ছে।
কোর্ট ম্যারেজ বলতে সাধারণত এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ের ঘোষণা দেওয়াকে বোঝায়। যেখানে নারী-পুরুষ বা তরুণ-তরুণী তাদের ছবি সংযুক্ত করে ভবিষ্যতে বিয়েতে আবদ্ধ হবে বলে ঘোষণা দেয়। তবে আইনে এ ঘোষণা তেমন কোনো অর্থই বহন করে না। কাজী অফিসে বা আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত না হলে এটা বিয়ে বলে গণ্য হবে না।

যদিও এসব যুগলের ধারণা, এই এফিডেভিটের মাধ্যমে তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। কোর্ট ম্যারেজের পর অনেক দম্পতি ঘর-সংসারও করছেন। কিন্তু এ বিয়ের বৈধতা না থাকায় কোনো কারণে স্বামী স্ত্রীকে ছেড়ে গেলে সেই স্ত্রী তার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন না। কিংবা কোনো সমস্যার সৃষ্টি হলে স্বামীও আইনি প্রতিকার চাইতে পারবেন না। আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে নারী-পুরুষের জন্য নেওয়া সন্তানও অবৈধ। অর্থাৎ সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার থাকছে না।

আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, কোর্ট ম্যারেজের নামে এই হলফনামা ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখে নোটারি পাবলিক কিংবা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। কিন্তু এর মাধ্যমে আইন অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেছে, তা বলা যাবে না। কারণ, এটি একটি ঘোষণামাত্র। যদিও বিয়ের হলফনামা সম্পাদন করা বাধ্যতামূলক নয়। বিয়ে করতে হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী করতে হবে।

দেশের কোনো ধর্মেই কোর্ট ম্যারেজের বৈধতা নেই। কিন্তু আশঙ্কাজনক হারে কোর্ট ম্যারেজ বেড়ে গেছে। এর মাধ্যমে ছেলে-মেয়েদের দম্পতির মতো বসবাস করতে দেখা যাচ্ছে। প্রায়ই নিন্ম আদালতে এ ধরনের কেস দেখা যায়। আবার অনেকে স্বামীর কাছ থেকে খোরপোষের অর্থ আদায় করতে না পেরে আমাদের(আইনজীবী) কাছে শুধু এফিডেভিটের কাগজ নিয়ে আসেন। তাদের কাবিননামা আনতে বললে জানান, ‘বিয়ের সময় বলা হয়েছিল কোর্ট ম্যারেজের কাগজই তাদের বৈধ কাগজ’।

আদালতে দেখা যাচ্ছে , নবম-দশম শ্রেণী ও এইচএসসির অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরাও বয়স বেশি দেখিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করছে। এমনকি আইনি অজ্ঞতা থেকে স্কুল-কলেজ ড্রেস পরাবস্থায়ই কোর্ট ম্যারেজ করতে এসে ধরা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে কোর্ট ম্যারেজের পর মূল বিপাকটা হয় তালাক নিতে এলে। কারণ তাদের তো বিয়েই হয়নি। মুসলিম বিয়েতে কাবিননামাই হলো বিয়ের চুক্তিপত্র। সন্তানের বৈধ পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কাবিননামার প্রয়োজন। স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পত্তি আদায়েও কাবিননামা লাগে। মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে কাজীর মাধ্যমে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কাবিননামা সম্পন্ন করতে হবে।

মুসলিম বিয়ে ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বিয়ে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে। কার সঙ্গে কার, কত তারিখে, কোথায়, কত দেনমোহর ধার্য, কী কী শর্তে বিয়ে সম্পন্ন হলো- এর একটা হিসাব সরকারি নথিতে লিখে রাখাই হলো নিবন্ধন। এ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক। বর্তমান আইন অনুযায়ী, বিয়ে নিবন্ধন করার দায়িত্ব মূলত বরের ওপর বর্তায়। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করা আবশ্যক। অন্যথায়, নিকাহ নিবন্ধক ও পাত্রের ২ বছর পর্যন্ত বিনা শ্রম কারাদণ্ড অথবা ৩ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দুটো শাস্তিরই বিধান রয়েছে!

আসুন যার যার অবস্থান থেকে এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করি।

এডভোকেট এম. এ বাশার
জজ কোর্ট, ঢাকা।

Categories: মতামত বিশ্লেষণ

Tags: