জীবনের ১ম রক্তদান ছিলো ভয় ও আনন্দের

জীবনের ১ম রক্তদান ছিলো ভয় ও আনন্দের

রক্তদান একটি মহৎ কাজ। এক ব্যাগ রক্ত একজন মুমূর্ষু রোগী ও তার পরিবারের মুখে হাসি এনে দিতে পারে। আর সেই লক্ষে বাংলাদেশের আনাছে কানাছে হাজারো তরুণ-তরুণীরা নিজে রক্ত দান করে অন্যদেরকে রক্ত দান করার জন্য উৎসাহিত করে। আমিও কিন্তু ব্যতিক্রম নই। আমার প্রথম রক্তদানের সুযোগ হয় ২০০৯ সালে। যা এখনো প্রতি চারমাস পর পর বিদ্যমান।
২০০৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অনার্সে ভর্তি হই। মনোমুগ্ধকর এই সবুজ মধুর ক্যাম্পাসে আসা যাওয়ার যানবাহনের প্রধান মাধ্যম শার্টল ট্রেন। আর সেই শার্টল ট্রেনের প্রত্যেকটি বগিতে গানের সুর বাজতো এখনও বাজে। যা ক্ষনিকের জন্য হলেও আনন্দ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকে কয়েকটি সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত থাকলেও অনার্স ১ম বর্ষ থেকে আরো বেশ কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের সাথে পুরোদমে সক্রিয় ছিলাম এবং কয়েকটি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজ স্বার্থে দায়িত্ব পালন করেছি। সেই সূত্রে ভার্সিটির বিভিন্ন বিভাগের সহপাঠি, বড় আপু ও বড় ভাইদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
একদিন ১ম বর্ষের ক্লাস শেষে শহরে আসার জন্য ট্রেন স্টেশনের উদ্দেশ্যে বন্ধুদের সাথে হাটছিলাম। তখন রিক্সা থেকে এক বড় আপুর ইমাদ বলে ডাক শুনতে পাইলাম। তার সাথে আরো দুই বান্ধবীও ছিলো। আপুর নাম সুমাইয়া জাহান সুইটি। সবাই সুইটি নামে ডাকলেও আমি সুমাইয়া আপু বলে ডাকতাম। আপু তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে তৃতীয় বর্ষে অধ্যায়নত ছিলেন। তিনি আবার “জীবনবাতি” নামে একটি সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। একজন ব্লাড ডোনারও বঠে। যাই হোক আপুকে সালাম দেয়ার পর আপু রিক্সা থামায়।
আপু : কেমন আছিস?
আমি: আলহামদুলিল্লাহ, আপনি?
আপু: ভালো। ট্রেনের সিট পায়ছিস?
আমি: না।
আপু: তাহলে একাকার বগিতে আসিছ…. তারপর আমরা আমাদের গন্তব্যে হাটছিলাম।
ওহ! একটি কথা বলা হয় নি, শার্টল ট্রেনের সিট সোনার হরিণের মত।বন্ধু বান্ধব ছাড়াও প্রিয়জনরা একে অপরের জন্য সিট ধরে রাখতো, সম্ভবত এখনো রাখে। আমি এবং আমার বন্ধুসহ একাকার বগিতে উঠি আর আপুর উছিলায় সিটও মিলল। আমরা সবাই আড্ডাতে মেটে উঠি। ট্রেন যখন ষোলশহর স্টেশনে পৌছে হঠাৎ দেখি সুমাইয়া আপুর মুখ মলিন হয়ে গেলো আর কান্নার ভাব। জিজ্ঞাসা করলে জানায় কে যেনো ফোন করে বলল তার ভাবীকে অপারেশনের জন্য নগরীর রেড ক্রিসেন্ট,আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রামে ভর্তি করেছে। তখন আমরা সবাই আপুকে সাহস ও অভয় দিচ্ছিলাম। সেদিন আমি বাসায় না গিয়ে সিএনজি ভাড়া করে আপুর সাথে সরাসরি রেড ক্রিসেন্টে চলে যায়। সাথে বন্ধু মিনহাজও ছিলো। ঐখানে পৌছলে ডাক্তার “ও পজেটিভ” রক্ত যোগাড় করে দিতে বলে। তখন বন্ধু মিনহাজ তাৎক্ষণিক রক্ত দিতে রাজি হয়ে যায়। আমার রক্ত গ্রুপ বন্ধু মিনহাজের আগে থেকেই জানা আর রক্ত দিতে জোরাজুরি করে। সুমাইয়া আপুর ব্লাড ডোনারে চারমাস পূর্ণ না হওয়ায় কর্তব্যরত ডাক্তার রক্ত দিতে বারণ করে। প্রথমেই আমি রক্ত দিতে রাজি না হলেও বন্ধুর জোরাজুরি আর সুমাইয়া আপু কান্নাস্বরে আমাকে অনুরোধ করাতে শেষ পর্যন্ত হার মানি। আমাকে সাহস জোগাতে বন্ধু মিনহাজ প্রথমেই রক্ত দেয়। ঐ দিনই আমার প্রথম রক্তদানের অভিজ্ঞতা। সেদিন থেকেই আজ পর্যন্ত আত্মমানতার সেবায় রক্ত দানের মাধ্যমে নিজেকে উৎসর্গ করে আসছি। আমি রক্তযোদ্ধা কিংবা রক্তের ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তাছাড়া ভলান্টিয়ার হিসেবেও পরিচয় দিতে ভালো লাগে। আলহামদুলিল্লাহ আমার মোট সতের বার রক্তদান করার সুযোগ হয়েছে। আল্লাহ পাক আমাকে সুস্বাস্থ্য দান এবং আমৃত্যু পর্যন্ত রক্তদান মতো এই মহৎ কাজ করার তাওফীক দান করুক।

লেখক : মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন,কলামিস্ট

Categories: মতামত বিশ্লেষণ

Tags: